Live

অতিরিক্ত চিনি রপ্তানিতে সুবিধা এবং ইথানল উৎপাদনে চিনি ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে চিনির বকেয়া সময়মতো আখ চাষিদের মেটানো সুনিশ্চিত হবে

চিনি রপ্তানি বাড়াতে যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে এবং ইথানলের জন্য চিনির ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে, আখ চাষিদের বকেয়া সময়মতো মেটানো সম্ভব হবে।

/
69047 views
31 mins read

কেন্দ্রীয় সরকার অতিরিক্ত চিনি রপ্তানি বাড়াতে যথাযথ উদ্যোগ নিচ্ছে এবং ইথানলের জন্য চিনির ব্যবহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে, আখ চাষিদের বকেয়া সময়মতো মেটানো সম্ভব হবে। পক্ষান্তরে, কৃষি অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। দেশে গত কয়েক বছরে অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে চিনি উৎপাদিত হয়েছে। এই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার চিনি কলগুলিকে উৎপাদিত চিনির ব্যবহারে আরও বৈচিত্র্য আনতে উৎসাহিত করছে। এই লক্ষ্যে ইথানল উৎপাদনের জন্য চিনিকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসা হচ্ছে। সেইসঙ্গে, চিনি রপ্তানিতে আরও সুযোগ-সুবিধা দিতে চিনি কলগুলিকে আরও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে চিনি কলগুলির কাছে নগদ অর্থের যোগান বাড়বে। অন্যদিকে, আখ চাষিরাও বকেয়া অর্থ সময়মতো হাতে পাচ্ছেন।
দেশে গত তিনটি চিনি মরশুমে (২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০) যথাক্রমে প্রায় ৬ লক্ষ ২০ হাজার মেট্রিক টন, ৩৮ লক্ষ মেট্রিক টন এবং ৫৯.৬ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি রপ্তানি করা হয়েছে। বর্তমান ২০২০-২১ চিনি মরশুমে (অক্টোবর-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে) সরকার ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনির রপ্তানিতে মেট্রিক টন প্রতি ৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এমনকি, প্রায় ৭০ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি রপ্তানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ৫৫ লক্ষ মেট্রিক টনের চিনি রপ্তানি হয়েছে।


আসন্ন ২০২১-২২ চিনি মরশুমে রপ্তানির জন্য ইতিমধ্যেই কিছু চিনি কল চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চিনি রপ্তানির ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে। একইভাবে, দেশে চিনি কলগুলিতে চিনির অভ্যন্তরীণ মূল্য স্থিতিশীল থাকবে।
অতিরিক্ত উৎপাদিত চিনির সমস্যা নিরসনে স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে সরকার চিনি কলগুলিকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করছে। এর মধ্যে আখ থেকে ইথানল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ইথানল পেট্রোলের সঙ্গে মিশিয়ে তা বিপণন করা হচ্ছে। এর ফলে, না কেবল জ্বালানির ওপর আমদানি নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বাবদ বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় বাড়ছে। ইথানল বিক্রি করে চিনি কলগুলির যে রাজস্ব হচ্ছে তা আখ চাষিদের বকেয়া মেটাতে কাজে লাগছে। ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ এই দুটি চিনি মরশুমে যথাক্রমে প্রায় ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন এবং ৯ লক্ষ ২৬ হাজার মেট্রিক টন চিনি ইথানল উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি চিনি মরশুম ২০২০-২১-এ ২০ লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি চিনি ইথানল উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আসন্ন ২০২১-২২ চিনি মরশুমে প্রায় ৩৫ লক্ষ মেট্রিক টন চিনি ইথানলের কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। একইভাবে, ২০২৪-২৫ মরশুম নাগাদ প্রায় ৬০ লক্ষ মেট্রিক চিনির বৈচিত্র্যকরণ করে ইথানলে রূপান্তরিত করা হবে। এর ফলে, অতিরিক্ত উৎপাদিত চিনির সমস্যা যেমন মিটবে, অন্যদিকে চিনি কলগুলির পক্ষে চাষিদের বেকায় সময়মতো মেটানো সম্ভব হবে। অবশ্য, উৎপাদিত ইথানলের ব্যবহার বাড়াতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্যে আগামী ২-৩ বছরে ইথানল উৎপাদনের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত চিনির রপ্তানিও অব্যাহত থাকবে। দেশে গত তিনটি চিনি মরশুমে প্রায় চিনি কলগুলির ২২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে ইথানল বিক্রি করে এই রাজস্ব হয়েছে। চলতি ২০২০-২১ চিনি মরশুমে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা চিনি কলগুলির রাজস্ব হিসেবে আয় হয়েছে। রাজস্ব হিসেবে পাওয়া এই টাকা দিয়ে চিনি কলগুলি কৃষকদের বকেয়া সময়মতো মেটাতে পারছে।
দেশে ২০১৯-২০ চিনি মরশুমে বকেয়া পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫,৮৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭৫,৭০৩ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই বকেয়া বাবদ মেটানো হয়েছে। কেবল ১৪২ কোটি টাকা এখনও বকেয়া রয়েছে। অবশ্য, চলতি ২০২০-২১ চিনি মরশুমে চিনি কলগুলি ৯০,৮৭২ কোটি টাকার চিনি ক্রয় করেছে যা একটি রেকর্ড। এমনকি চলতি মরশুমের ১৬ আগস্ট পর্যন্ত চিনি কলগুলি বকেয়া হিসেবে চাষিদের ৮১,৯৬৩ কোটি টাকা মিটিয়ে দিয়েছে। বাকি পড়ে রয়েছে ৮,৯০৯ কোটি টাকা। চিনি রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং ইথানল উৎপাদনের কাজে চিনির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার দরুণ কৃষকদের প্রাপ্য বকেয়া মেটানোও ত্বরান্বিত হয়েছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির মূল্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে, ভারতীয় অপরিশোধিত চিনির চাহিদাও বেড়েছে। এই প্রেক্ষিতে মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সমস্ত চিনি কলগুলিকে পরামর্শ জারি করে বলা হয়েছে, আসন্ন ২০২১-২২ মরশুমে অপরিশোধিত চিনি রপ্তানির পরিকল্পনা আগেভাগেই চূড়ান্ত করে রাখতে যাতে, রপ্তানিকারীরা আন্তর্জাতিক বাজারের চড়া দামের সুবিধা নিতে পারে। সেইসঙ্গে, চড়া দামের সুবিধার সুফল চিনি কলগুলির কাছ থেকে চাষিদের কাছেও পৌঁছে যায়। ওই পরামর্শে আরও বলা হয়েছে ইথানলের জন্য চিনির ব্যবহার আরও বাড়াতে। এজন্য দেশীয় বাজারে মাসিক কোটা অনুযায়ী অতিরিক্ত উৎসাহ ভাতা দেওয়া হবে।
বেশি পরিমাণে ইথানল উৎপাদনে চিনির ব্যবহার এবং রপ্তানির ফলে না কেবল চিনি কলগুলির কাছে নগদ অর্থের যোগান বাড়বে, সেইসঙ্গে তারা আখ চাষিদের বকেয়াও সময়মতো মেটাতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে দেশীয় বাজারে চিনি কলগুলিতে চিনির মূল্য স্থিতিশীল থাকবে। পক্ষান্তরে, চিনি কলগুলির রাজস্ব বাড়বে এবং অতিরিক্ত উৎপাদিত চিনির সমস্যার সমাধান হবে। অতিরিক্ত পরিমাণে উৎপাদনের ফলে জ্বালানিতে ইথানলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে এবং এর ফলে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির পরিমাণ কমবে। পক্ষান্তরে, বায়ু দূষণ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দূর করা সম্ভব হবে। সর্বোপরি, কৃষি-অর্থনীতির বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!
Don`t copy text!